ভালো কাজে কিভাবে এগিয়ে যাব

বিডি7ডে ডেস্ক: ঈমানের দাবিদাররা দুই ধরনের হয়ে থাকে। এক দল হচ্ছে, যাদের রয়েছে মুনাফিকির অভ্যাস। এরা মানসিকভাবে দুর্বল। জাগতিক চাওয়া-পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এদের মধ্যে প্রবল। অন্য দলের রয়েছে ঈমানি শক্তি। রয়েছে চিন্তার বিশুদ্ধতা, সংকল্পের দৃঢ়তা, কষ্টসহিষ্ণুতা ও দুঃখ-কষ্টের মধ্যে টিকে থাকার মনোবল। এই দুই দলের পদক্ষেপ ভিন্ন ভিন্ন। প্রথম দলের পদক্ষেপ হচ্ছে—বক্রতা, পিছপা হওয়া ও দায়িত্ব পালন থেকে দূরে থাকা। অন্য দলের পদক্ষেপ হচ্ছে—দৃঢ়তা, দানশীলতা, মহানুভবতা ও আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন। মুনাফিকরা ইবাদতে পিছিয়ে থাকে। আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশ এলে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তারা অজুহাত পেশ করে। ভালো কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখে। যেমন—দেখা গিয়েছিল তাবুক যুদ্ধে যাওয়ার নির্দেশ আসার পর। মুনাফিকরা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে দুর্বল, অসহায়, রুগ্ণ, পীড়িত, বয়োবৃদ্ধ, নারী ও শিশুদের মতো পেছনে রয়ে গিয়েছিল। এতে মুমিনদের এই শিক্ষা রয়েছে যে পিছুটান নয়, বরং ইবাদতে প্রতিযোগিতা প্রয়োজন, একে অন্যকে অতিক্রম করার মানসিকতা দরকার।

সৃষ্টিগতভাবে মানুষের মধ্যে একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার প্রবণতা দেখা যায়। লেখাপড়া, খেলাধুলা, সম্পদ সংগ্রহ, জীবনের বিভিন্ন উপকরণ সংগ্রহ, শৈল্পিক কাজকর্ম থেকে শুরু করে মানবজীবনের সব ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতা, একে অন্যকে অতিক্রম করার মানসিকতা দেখা যায়। এটা নিন্দনীয় নয়, প্রশংসনীয়। মানুষের মধ্যে এই অতিক্রম করার মানসিকতা না থাকলে সভ্যতার চাকা কিছুতেই এগিয়ে যেতে পারত না। ঈমানদারের জন্য জাগতিক ভালো কাজে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি পরকালের কল্যাণের জন্য প্রতিযোগিতা থাকা দরকার। ইবাদতে একে অন্যকে অতিক্রম করার মানসিকতা থাকা দরকার। এটাই কোরআনের দাবি। ঈমানের দাবি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং তোমরা ভালো কাজে প্রতিযোগিতা করো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৪৮)

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা অগ্রসর হও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে, যার বিস্তৃতি আসমান ও জমিনের মতো, যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে দায়িত্বনিষ্ঠদের (মুত্তাকিদের) জন্য।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৩)

অন্য আয়াতে এসেছে : ‘পুণ্যবানরা তো থাকবে পরম স্বাচ্ছন্দ্যে। তারা সুসজ্জিত আসনে বসে অবলোকন করবে। তুমি তাদের মুখমণ্ডলে স্বাচ্ছন্দ্যের দীপ্তি দেখতে পাবে। তাদের মোহরাঙ্কিত বিশুদ্ধ পানীয় পান করানো হবে। এর মোহর হবে মিশকের (মিসেকর), এ বিষয়ে প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করুক।’ (সুরা : মুতাফিফফিন, আয়াত : ২২-২৬)

উম্মতে মুহাম্মদির তিনটি দলের অবস্থা বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর আমি কিতাবের (কোরআন) অধিকারী করেছি আমার বান্দাদের মধ্যে মনোনীতদের। তবে তাদের কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী (পাপী), কেউ মধ্যপন্থী আর কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী। এটাই মহা অনুগ্রহ।’ (সুরা : ফাতির, আয়াত : ৩২)

সাহাবায়ে কেরাম হলেন শ্রেষ্ঠতম মুসলমান। ভালো কাজে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে তাঁদের জুড়ি নেই। ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার (তাবুক যুদ্ধের সময়) আমাদের দান-সদকা করতে বলেন। তখন আমার কাছে অনেক সম্পদ ছিল। আমি (মনে মনে) বললাম, আজ আমি আবু বকর (রা.)-কে অতিক্রম করব। সুতরাং আমি আমার সম্পদের অর্ধেক অংশ নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে হাজির হয়ে গেলাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে জিজ্ঞেস করেন, পরিবার-পরিজনের জন্য কী রেখে এসেছ? আমি বললাম, এর সমান সম্পদ। অতঃপর আবু বকর (রা.) তাঁর সহায়-সম্পদ নিয়ে এলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকেও জিজ্ঞেস করেন, পরিবার-পরিজনের জন্য কী রেখে এসেছ? তিনি বলেন, তাদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে রেখে এসেছি। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আমি কখনো কোনো কিছুতে তাঁকে অতিক্রম করতে পারব না। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৬৭৫, আবু দাউদ, হাদিস : ১৬৭৮)

একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলতে লাগলেন, তোমাদের মধ্যে আজ কে রোজা রেখেছ? আবু বকর (রা.) বলেন, আমি। রাসুলুল্লাহ (সা.) পুনরায় বলেন, তোমাদের মধ্যে আজ কে জানাজায় অংশগ্রহণ করেছ? আবু বকর (রা.) বললেন, আমি। রাসুলুল্লাহ (সা.) আবার জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের মধ্যে আজ কে কোনো মিসকিনকে পানাহার দিয়েছ? আবু বকর (রা.) বলেন, আমি। রাসুলুল্লাহ (সা.) আবার জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের মধ্যে আজ কে কোনো অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করেছ? আবু বকর (রা.) বলেন, আমি। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, এই গুণাবলি যার মধ্যে থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (মুসলিম, হাদিস : ১০২৮)

এভাবেই সাহাবায়ে কেরাম ভালো কাজে একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতেন, একে অন্যের ওপর এগিয়ে যেতেন।

মহান আল্লাহ আমাদের আমল করার তাওফিক দান করুন।